ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে আয়া ও ক্লিনার দিয়ে চলছে ড্রেসিং
মোঃ বাপ্পি শেখ, ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসায় চরম অবহেলা, রোগীর স্বজনদের সাথে অশালীন দুর্ব্যবহার, জোরপূর্বক ছাড়পত্র (রিলিজ) প্রদান এবং ড্রেসিংয়ের নামে বেআইনিভাবে টাকা আদায়ের গুরুতর অভিযোগে দুই দায়িত্বরত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে থানায় একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
আজ ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে ভুক্তভোগী রোগীর স্বামী নিজে বাদী হয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় এই আইনি প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দুধসর চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. নাঈম মন্ডল (২৪) ওনার স্ত্রী রিমু (২০)-কে গত ২০ জুন সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ঝিনাইদহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে সফল সিজারের মাধ্যমে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। পরবর্তীতে গত ৬ জুলাই মা ও নবজাতক দুজনেই পুনরায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ওনাদের হাসপাতালের ইওসি (EOC) ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
অভিযোগকারীর দাবি, ৬ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. মারফিয়া ও ডা. মো. আলাউদ্দিন ওনাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে চরম অবহেলা প্রদর্শন করেন। রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও ওনারা যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদান করেননি।
আজ ১৯ জুলাই সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে নাঈম মন্ডল ওনার স্ত্রী ও সন্তানের সঠিক চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বরত ওই দুই চিকিৎসক ওনার ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ওনারা নাঈমের সাথে প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করেন, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে ওনাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের করে দেন। শুধু তাই নয়, চিকিৎসাধীন থাকা গুরুতর অসুস্থ প্রসূতি ও নবজাতককে অন্যায়ভাবে হাসপাতাল থেকে জোরপূর্বক ছাড়পত্র দিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
অভিযোগকারী নাঈম মন্ডল আরও উল্লেখ করেন, সরকারি হাসপাতালে সিট থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকেরা ওনাকে ওনার স্ত্রীকে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি (ইসলামী) হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য অনৈতিক চাপ দিচ্ছিলেন। ওনাদের কথামতো সেই প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি হতে রাজি না হওয়ার জের ধরেই ওনাদের সাথে এমন অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। বর্তমানে ওনার স্ত্রী ও নবজাতক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় অন্যত্র চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়াও হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় প্রতিদিন ক্ষতস্থান ড্রেসিং করার জন্য ওনাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ১০০ টাকা করে নেওয়া হতো এবং টাকা না দিলে ড্রেসিং বন্ধ রাখা হতো বলেও নাঈম মন্ডল লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মের খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী হাসপাতালে তথ্য সংগ্রহে যান। এ সময় সাংবাদিকরা সরেজমিনে দেখতে পান, হাসপাতালের নার্স বা চিকিৎসকদের পরিবর্তে ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী (ক্লিনার) ও আয়াদের দিয়ে সংবেদনশীল ড্রেসিংয়ের মতো চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজ করানো হচ্ছে। এই অনিয়ম ও অবৈধ টাকা আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন করলে দায়িত্বরত কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স ও ক্লিনার সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন এবং চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীতে এই সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা ও লিখিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমানের কার্যালয়ে যাওয়া হলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে অত্যন্ত অপেশাদার আচরণ করেন এবং কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমি এই বিষয়ে কোনো কথা বলব না, আপনাদের যা করার আপনারা করেন।" ওনার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যে উপস্থিত সাংবাদিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এই বর্বরোচিত ও অমানবিক ঘটনার পর ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, একটি ২৫০ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতালে এ ধরনের প্রকাশ্য অনিয়ম, অবহেলা ও রোগীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং দায়ী চিকিৎসকদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা দরকার। ঝিনাইদহ সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগটি ওনারা পেয়েছেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
|