এক বছরে ক্রিপ্টো ব্যবসা থেকে প্রায় ১২০ কোটি ডলার আয় ট্রাম্পের
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের মসনদে বসার বা প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় ট্রাম্পের ক্রিপ্টো ব্যবসাগুলো ছিল একেবারেই নতুন। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবসা তাঁর দীর্ঘ কয়েক দশকে গড়ে তোলা বিশাল ও ঐতিহ্যবাহী রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যের অনেক বড় বড় অংশকেও আয়ের দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনকুবের বিনিয়োগকারীদের প্রকাশ্য সমর্থন এবং ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর ক্রিপ্টো শিল্পের ওপর ফেডারেল সরকারের কড়াকড়ি শিথিল করার নীতিগত পদক্ষেপই এই ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
সরকারি নৈতিকতা দপ্তরে জমা দেওয়া ৯২৭ পৃষ্ঠার ওই বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, ট্রাম্প তাঁর ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ নামক প্রতিষ্ঠান থেকে গভর্ন্যান্স টোকেনসহ বিভিন্ন ক্রিপ্টো পণ্য বাজারে ছেড়ে ও বিক্রি করে ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) ডলারের বেশি আয় করেছেন।
এর পাশাপাশি তাঁর মালিকানাধীন আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘সিআইসি ডিজিটাল এলএলসি’ (CIC Digital LLC) ট্রাম্পের নিজস্ব ছবি সংবলিত মিম কয়েন বিক্রি করে ৬০ কোটি (৬০০ মিলিয়ন) ডলারের বেশি ঘরে তুলেছে। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ট্রাম্পের এই বিপুল পরিমাণ টোকেন ও মিম কয়েন সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রির পর থেকেই সেগুলোর বাজারমূল্য অবিশ্বাস্যভাবে ধসে গেছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সির এই ডিজিটাল দুনিয়ার বাইরেও ট্রাম্প গত বছর তাঁর নিজস্ব ব্র্যান্ডের বাইবেল, বিশেষ নকশার স্নিকার (জুতো), হাতঘড়ি ও অন্যান্য প্রমোশনাল পণ্য বিক্রি করেও কয়েক মিলিয়ন ডলার পকেটে পুরেছেন। এর মধ্যে শুধু ‘ট্রাম্প ব্র্যান্ড’ ঘড়ি বিক্রি থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত আয় হয়েছে ৪৭ লাখ (৪.৭ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার।
সরকারি এই বিবরণী প্রকাশের পর সমালোচকরা দাবি করছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ব্যবসায়িক স্বার্থের মাধ্যমে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ রকেটের গতিতে বেড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ট্রাম্পের এসব ব্যবসার অনেকগুলোই মূলত তাঁর নিজস্ব প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্তের সুবিধাভোগী। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করে আসছেন এবং বলে আসছেন যে তাঁর সব আর্থিক বিষয়াদি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাঁর ছেলেরা পরিচালনা করেন। বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘ফোর্বস’–এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ট্রাম্পের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৪ সালেও ছিল মাত্র ২.৩ বিলিয়ন ডলার।
বিদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সম্প্রসারণ
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রিপ্টোর পাশাপাশি ট্রাম্পের চিরচেনা আন্তর্জাতিক রিয়েল এস্টেট ব্যবসারও বড় ধরনের বৈশ্বিক সম্প্রসারণ ঘটেছে। গত এক বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আবাসন প্রকল্প থেকে ট্রাম্পের ব্যবসা ১ কোটি ৪ লাখ (১০.৪ মিলিয়ন) ডলার আয় করেছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি প্রকল্প থেকে এসেছে ৯০ লাখ (৯ মিলিয়ন) ডলার। পাশাপাশি ইউরোপের দেশ রোমানিয়ার বুখারেস্ট এবং মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে পৃথক দুটি রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট থেকে ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) ডলার করে আয় এসেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত ট্রাম্পের বিলাসবহুল ‘মার-এ-লাগো রিসোর্ট’ থেকেও আয় আকাশচুম্বী হয়েছে। গত এক বছরে এই বিশেষ সম্পত্তি থেকে তাঁর আয় হয়েছে ৭ কোটি ৭০ লাখ (৭৭ মিলিয়ন) ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। তবে ফেডারেল সরকারের এই আর্থিক বিবরণীতে কেবল মোট আয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে, এর বিপরীতে প্রকৃত নিট মুনাফার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
ক্রিপ্টো নীতিতে বড় বদল ও বিতর্ক
পুনরায় ওয়াশিংটনের ক্ষমতায় ফিরে এসেই ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্ববর্তী জো বাইডেন প্রশাসনের কঠোর ক্রিপ্টো নীতি ও নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ সরে আসেন এবং এই খাতের জন্য অত্যন্ত উদার ও শিল্পবান্ধব অবস্থান গ্রহণ করেন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো শুরু থেকেই এই গভর্ন্যান্স টোকেন নিয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে আসছিল। নিয়ন্ত্রকদের মতে, এসব টোকেন শেয়ারবাজারের মতো কোনো কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা নিশ্চিত করে না, বরং কেবল নির্দিষ্ট কিছু করপোরেট সিদ্ধান্তে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেয়। ফলে এর প্রকৃত আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা অসম্ভব।
তা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে বড় বড় বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্পের ক্রিপ্টো সম্পদ কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। এর মধ্যে বিতর্কিত চীনা ধনকুবের জাস্টিন সান একাই ট্রাম্পের গভর্ন্যান্স টোকেনে ৭ কোটি ৫০ লাখ (৭৫ মিলিয়ন) ডলার এবং ট্রাম্পের মিম কয়েনে ২০ কোটি (২০০ মিলিয়ন) ডলারের বিশাল বিনিয়োগ করেন। মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে জাস্টিন সানের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে বিনিয়োগকারীদের প্রতারণার অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি ঝুলে থাকা ফেডারেল মামলা রহস্যজনকভাবে স্থগিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত মাত্র ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) ডলার জরিমানার বিনিময়ে রফা বা নিষ্পত্তি হয়ে যায়। জাস্টিন সান অবশ্য বারবার দাবি করেছেন, ট্রাম্পের ব্যবসায় তাঁর এই বিপুল বিনিয়োগের সঙ্গে ওই আইনি মামলা নিষ্পত্তির কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই।
এদিকে, বাজারে ছাড়ার পর থেকে ট্রাম্প-সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো সম্পদের মূল্য ক্রমান্বয়ে তলানিতে এসে ঠেকেছে। ওয়ার্ল্ড লিবার্টি টোকেনের দাম বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চালুর পর একসময় যে ট্রাম্প মিম কয়েনের দাম সর্বোচ্চ ৭৪ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তা বর্তমানে মাত্র ১ দশমিক ৬৮ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। ফলে বড় লোকসানে পড়েছেন সাধারণ খুচরা ক্রেতারা।
হোয়াইট হাউসের আত্মপক্ষ সমর্থন
এই বিপুল আয় ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে জলঘোলা শুরু হলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এক বিবৃতিতে জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আসার আগেই তাঁর সমস্ত ব্যবসা ছেলেদের পরিচালিত একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ট্রাস্টের অধীনে হস্তান্তর করেছেন এবং তিনি কোনো প্রকার ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত নন। মুখপাত্র বলেন, “প্রেসিডেন্ট কিংবা তাঁর পরিবারের সদস্যরা কখনোই ক্ষমতার অপব্যবহার বা স্বার্থের সংঘাতে জড়াননি এবং ভবিষ্যতেও জড়াবেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের সব সিদ্ধান্তই মার্কিন জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নেওয়া হয়েছে।”
একই সঙ্গে ‘ট্রাম্প অর্গানাইজেশন’ এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, বিদেশের মাটিতে তাদের সমস্ত চুক্তিই সম্পূর্ণ বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হয়েছে, কোনো দেশের সরাসরি সরকারের সঙ্গে নয়। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদলীয় শাসন বা রাজতন্ত্র পরিচালিত মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোতে সরকারি সিদ্ধান্ত ও বেসরকারি খাতের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রেখা টানা কার্যত অসম্ভব।
সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিয়েতনামে নতুন একটি ট্রাম্প রিসোর্ট প্রকল্প থেকে গত বছর ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছে; ঠিক একই সময়ে দেশটির কমিউনিস্ট সরকার ওই প্রকল্পের চূড়ান্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন দেয়। ঘটনাচক্রে, একই সময়ে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে রপ্তানি শুল্কে বড় ছাড় পায়, কাতার উন্নত মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহারের এক্সক্লুসিভ সুযোগ পায় এবং সৌদি আরব দীর্ঘদিনের আটকে থাকা মার্কিন যুদ্ধবিমান পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জন করে। তবে ট্রাম্পের এই পারিবারিক ব্যবসায়িক চুক্তিগুলো সরাসরি ওয়াশিংটনের নীতিগত সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আইনিভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
|