সাংবাদিকের কাজ সাংবাদিকতা করা, রাজনীতিবিদ হওয়া নয়: সাংবাদিক কামরুল

প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪১ অপরাহ্ণ
সাংবাদিকের কাজ সাংবাদিকতা করা, রাজনীতিবিদ হওয়া নয়: সাংবাদিক কামরুল
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (বেরোবিসাস) এক যুগপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন ঢাকা পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম।

সাংবাদিক পেশার মূল নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের জায়গাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঢাকা পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, “সাংবাদিক পেশায় যারা আছি, আমি বলব কখনোই রাজনীতিবিদ না হওয়ার জন্য। সাংবাদিকের কাজ সাংবাদিকতা করা, রাজনীতিবিদ হওয়া নয়।” গণমাধ্যমে বা টকশোতে অনেক সময় সাংবাদিকদের অতিমাত্রায় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়—এমন সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর পেছনে একটাই কারণ থাকতে পারে, আর তা হলো ব্যক্তিস্বার্থ বা সুবিধাভোগী মানসিকতা। সুবিধাভোগী না হলে কেউ কখনোই রাজনীতিবিদের চেয়েও বড় বা অতিরিক্ত কিছু হওয়ার চেষ্টা করেন না।

আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (বেরোবিসাস) এক যুগপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে মো. কামরুল ইসলাম আরও বলেন, “আজকে বিএনপি ক্ষমতায় আছে, কাল বিএনপি ক্ষমতায় নাও থাকতে পারে। জামায়াতে ইসলামীও আসতে পারে, আবার পুনরায় আওয়ামী লীগও ফিরে আসতে পারে। আমাদের কথা হচ্ছে, অবশ্যই সম্পূর্ণ সততার জায়গা থেকে আমরা আমাদের লেখনীর মাধ্যমে সেই অবস্থানটি ধরে রাখতে চাই; যেন আজ থেকে ১০ বছর পরেও আমার লেখার মাধ্যমে শুধু সমাজ নয়, গোটা দেশের পরিবর্তন হবে, আমার এই ক্যাম্পাসের কাঠামোগত পরিবর্তন সাধিত হবে।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও শহিদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আজকে আবু সাঈদ আমাদের জন্য একটা বড় উদাহরণ হতে পারত, কিন্তু সমস্যা হলো আমরা তা থেকে শিক্ষা নিই না। এত বড় একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে গেল, আমরা কি আসলেই তা থেকে শিক্ষা নিতে পেরেছি? গত দুই বছরের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আমরা পার করলাম, নতুন সরকার এল। নতুন এই সরকারকে তো পুরনো অনেক নেগেটিভ জিনিস বা জঞ্জাল বয়ে বেড়াতে হচ্ছে, সুতরাং তাদের কিছুটা সময় দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত ৮-৯ মাস আমরা পার করে ফেললাম, আসলেই কি বড় কোনো পরিবর্তনের জায়গা আমরা দেখতে পাচ্ছি?”

তৃণমূল ও ক্ষমতার কাঠামোগত আচরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “রুট লেভেলে গিয়ে দেখেন, আগে যে অপকর্মগুলো বা দখলদারিত্ব আওয়ামী লীগ করত, ঠিক সেই একই কাজগুলো এখন বিএনপি কিংবা অন্য দলগুলোর সমর্থক বা নেতাকর্মীরাও একই ভূমিকায় করছে। তাহলে এই কাক্সিক্ষত পরিবর্তনটা কবে হবে আসলে? এই পরিবর্তনটা আসতেই হবে, নতুবা কোনোভাবেই এই দেশের প্রকৃত মঙ্গল কামনা করার সুযোগ নেই।”

টিভির পর্দা ও গণমাধ্যমের বর্তমান চালচিত্র নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, “টিভির পর্দাগুলোতে অতীতে যে চরিত্রটা আমরা দেখেছি, বর্তমানে জাস্ট রিভার্স বা উল্টো একই চরিত্র আবার দেখতে পাচ্ছি। আমার কথা হচ্ছে, আপনারা সরকারের সমালোচনা করুন। যেকোনো সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা সাংবাদিকদের করতেই হবে। আর যারা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বা অবস্থানে আছেন, তাদেরও সেই সমালোচনা হাসিমুখে সহ্য বা ক্যারি করার মানসিকতা থাকতে হবে। চেয়ারগুলো এমনই এক পবিত্র জায়গা, সমালোচনা হজম করতে না পারলে সেই চেয়ার আপনার জন্য নয়। একটি গঠনমূলক সমালোচনা মানুষকে শুদ্ধ করে, একজন নীতিনির্ধারকের সমস্ত ভুল সিদ্ধান্তকে সংশোধন করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। সব সিদ্ধান্ত সবার ভালো হবে না, সরকারেরও সব সিদ্ধান্ত নিখুঁত হবে না। কিন্তু যে জিনিসগুলো জনস্বার্থের পরিপন্থী, সাংবাদিক ভাইয়েরা যদি সাহসের সঙ্গে তা জাতির সামনে তুলে ধরেন, डेफिनेटলি সেই সিদ্ধান্ত বদলাতেও পারে যদি তাতে দেশের ও জনগণের মঙ্গল হয়।”

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি আরও বলেন, “একটি গণআন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থান যেকোনো দেশে যেকোনো সময় হতেই পারে। কিন্তু একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের পর কেন দেশের একজন জাতীয় মসজিদের খতিবকে হারিয়ে বা পালিয়ে যেতে হবে? কেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারিকে আত্মগোপনে বা পালিয়ে যেতে হবে? এগুলো অত্যন্ত দুঃখজনক। আজকে বাংলাদেশে যে নতুন পরিবর্তিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এটি শহিদ আবু সাঈদের হাত ধরে এবং তাঁর নিজের জীবন দিয়ে বাংলাদেশকে বদলে দেওয়ার এক অনন্য চেষ্টার ফসল। আমরা জানি না এই পরিবর্তিত বাংলাদেশকে কতটুকু সুসংহত রাখতে পারব। তারপরও বলব, আমাদের সবার সম্মিলিত ও সচেষ্ট প্রচেষ্টায় আমরা এই দেশকে ভবিষ্যৎমুখী করতে চাই, কর্মমুখী করতে চাই এবং একটি সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”