কেমোথেরাপি ছাড়াই স্তন ক্যান্সার চিকিৎসা সম্ভব: গবেষণা
স্বাস্থ্য ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত লাখ লাখ নারীর জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের একটি বিশাল অংশকে আর কেমোথেরাপির মতো অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও ক্ষতিকারক থেরাপির মুখোমুখি হতে হবে না। নতুন এক আধুনিক জিনগত বা জেনোমিক (Genomic) পরীক্ষার মাধ্যমে এখন চিকিৎসকেরা শতভাগ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে পারছেন কোন রোগীর শরীরে কেমোথেরাপি দেওয়া অত্যাবশ্যক এবং কে কেমোথেরাপি ছাড়াই সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন। গতকাল শনিবার (৩০ মে) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে এই চমকপ্রদ ও বৈপ্লবিক তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে।
আজ রবিবার (৩১ মে) দুপুর ১২টা ০২ মিনিটে প্রকাশিত এক বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অনন্য আবিষ্কারের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জনসমক্ষে আসে।
যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’ (ইউসিএল)-এর ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ‘অপটিমা’ (OPTIMA) নামে এই আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক গবেষণাটি সফলভাবে পরিচালিত হয়। এই বিশাল গবেষণায় যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের ৪০ বছরের বেশি বয়সী মোট ৪ হাজার ৪০০-এরও বেশি স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত নারী স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করেন।
গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হরমোন-সংবেদনশীল (Hormone-sensitive) স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত যেসব রোগীর শরীরে এই নতুন জিনগত পরীক্ষার স্কোর বা মাত্রা কম এসেছে, তারা কোনো প্রকার কেমোথেরাপি ছাড়াই শুধুমাত্র সাধারণ ‘হরমোন থেরাপি’ গ্রহণ করেই অত্যন্ত নিরাপদ ও সফলভাবে নিরাময় লাভ করতে পারেন।
গবেষণায় ব্যবহৃত এই বিশেষ জেনোমিক পরীক্ষার নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রোসিগনা’ (Prosigna)। এই পরীক্ষাটি মূলত রোগীর আক্রান্ত টিউমারের ভেতর থাকা ৫০টি সুনির্দিষ্ট জিনের সার্বিক গতিবিধি এবং কার্যক্রম অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে। এই বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকেরা হিসাব কষেন যে রোগীর শরীর থেকে টিউমারটি অপসারণের পর ভবিষ্যতে আবারও ক্যান্সার ফিরে আসার বা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ঠিক কতটা রয়েছে। এই পরীক্ষার প্রাপ্ত স্কোরের ওপর ভিত্তি করেই এখন ওয়ান-টু-ওয়ান ভিত্তিতে চিকিৎসকরা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন যে রোগীর কেমোথেরাপির প্রয়োজন আছে কি না।
গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী নারীদের দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি মানুষকে কোনো প্রকার কেমোথেরাপি না দিয়ে শুধুমাত্র হরমোন থেরাপির মাধ্যমেই সফলভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। সাধারণত স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপির ব্যবহারের ফলে রোগীদের চুল পড়া, চরম ক্লান্তি, বমিভাব, প্রজননজনিত দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা এবং শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার মতো নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতা ও মানসিক অবসাদের মুখোমুখি হতে হয়। নতুন এই আবিষ্কারের ফলে রোগীরা এই সমস্ত ধকল থেকে স্থায়ী মুক্তি পাবেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেসব রোগীর জিন স্কোর কম ছিল এবং যারা কেমোথেরাপি নেননি, তাদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার হার ছিল অবিশ্বাস্য রকমের বেশি— প্রায় ৯৩.৭ শতাংশ। অন্যদিকে, যারা কেমোথেরাপি নিয়েছেন, তাদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৪.৯ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দলের বেঁচে থাকার হারের মাঝে কোনো উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক পার্থক্য নেই, যা প্রমাণ করে কম ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য কেমোথেরাপি মূলত অপ্রয়োজনীয়।
সাধারণত স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে প্রথমে অস্ত্রোপচারের (Surgery) মাধ্যমে টিউমারটি কেটে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর লিম্ফ নোডের আশপাশে ক্যান্সার কোষ ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকরা কেমোথেরাপির পরামর্শ দেন। তবে চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ছিল যে, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি আসলে সামান্যই উপকারে আসে, অথচ এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। ইউসিএল-এর হিসাব মতে, শুধু যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার (NHS) অধীনেই প্রতি বছর অন্তত ৫ হাজার রোগী এই পরীক্ষার মাধ্যমে কেমোথেরাপির ধকল এড়াতে পারবেন।
এই পরীক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে কার্ডিফের বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী স্তন ক্যান্সারের রোগী কারেন বনহ্যাম নিজের আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “এই গবেষণার ফল আমার মতো হাজারো রোগীর জন্য এক পরম স্বস্তির খবর; এটি যেন ঠিক বড়দিনের কোনো জাদুকরী উপহার পাওয়ার মতো। এই পরীক্ষার কারণে আমি কেমোথেরাপির যন্ত্রণা এড়াতে পেরেছি এবং বিগত আট বছর ধরে শুধু রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপি নিয়ে দিব্যি সুস্থ আছি। ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া মানেই জীবনের অগ্রাধিকার বদলে যাওয়া, যেখানে একমাত্র ইচ্ছাই থাকে কেবল বেঁচে থাকা।”
গবেষণা কার্যক্রমের প্রধান ও ইউসিএল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বরেণ্য স্তন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রব স্টেইন বলেন, “এই ফলাফল ক্যান্সার চিকিৎসাকে ব্যক্তিভেদে বা পারসোনালাইজড (Personalised Medicine) করার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অগ্রগতি। এখানে শুধু প্রচলিত ক্লিনিক্যাল লক্ষণের ওপর নির্ভর না করে টিউমারের নিজস্ব জৈবিক বা বায়োলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানো হয়েছে। এর ফলে রোগীরা যেমন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচবেন, তেমনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপুল অর্থ ও সম্পদের অপচয় রোধ হবে।” তবে এই পরীক্ষাটি এখনই ৪০ বছরের কম বয়সী তরুণী রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না, তা এখনও পরীক্ষা করা হয়নি। সেই বিষয়ে চূড়ান্ত ক্লিনিক্যাল ফল পেতে বিজ্ঞানীদের আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
জান্নাত সকালাবেলা
|