ইসরায়েলি হামলায় গাজায় বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখানোর আয়োজক নিহত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চরম যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার চারিদিকে যখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ আর মৃত্যুর মিছিল, ঠিক তখনই ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উন্মাদনা গাজাবাসীর জীবনে এনে দিয়েছিল ক্ষণিকের স্বস্তি ও উদযাপনের সুযোগ। প্রিয় দলের জয়ে একটুখানি হাসার রসদ পাচ্ছিলেন বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ। কিন্তু সেই আনন্দের আকাশে বজ্রপাত ঘটিয়ে দিল ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। গাজার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে বড় পর্দায় ফুটবল বিশ্বকাপ প্রদর্শনের মূল উদ্যোক্তা ও বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি ত্রাণকর্মী মোহাম্মদ আল-ওয়াহিদি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অত্যন্ত মর্মান্তিক ও আকস্মিকভাবে নিহত হয়েছেন।
আজ শুক্রবার (১০ জুলাই) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি ও আলজাজিরার বরাতে এই হৃদয়বিদারক তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার গাজা সিটির সাবরা এলাকার একটি অভ্যন্তরীণ সড়ক দিয়ে সাধারণ একটি ট্যাক্সিতে করে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়া একটি দূরনিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি গাড়িটিতে আঘাত হানে। ক্ষেপণাস্ত্রের প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ট্যাক্সিটি মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই ৬৫ বছর বয়সী প্রবীণ সমাজকর্মী আল-ওয়াহিদিসহ মোট চারজন আরোহী নিহত হন। বরাবরের মতোই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (IDF) দাবি, তারা মূলত ওই ট্যাক্সিতে থাকা হামাসের এক উচ্চপদস্থ সদস্যকে লক্ষ্য করে এই নিখুঁত হামলাটি চালিয়েছিল।
আল-ওয়াহিদি গাজা সিটি, দেইর আল-বালাহ এবং দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি অঞ্চলের বিভিন্ন উদ্বাস্তু শিবিরে বিশাল বড় স্ক্রিন বা প্রজেক্টর টাঙিয়ে যুদ্ধক্লান্ত মানুষের জন্য খেলা দেখার বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। কাকতালীয়ভাবে, তাঁর মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর (Round of 16) হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল আরব পরাশক্তি মিসর। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগেই প্রিয় এই মানুষের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গাজার স্টেডিয়াম-সদৃশ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আনন্দের বদলে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে আল-ওয়াহিদির ত্রাণ বিতরণ ও খেলা দেখানোর পুরোনো ছবি-ভিডিও শেয়ার করে শত শত মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ব্যক্তিজীবনে প্রায় ৬৫ বছর বয়সী আল-ওয়াহিদি আড়াই বছর আগে যুদ্ধ শুরুর পূর্বে গাজার একটি নামী স্কুলে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে সংঘাত শুরু হওয়ার পর তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে সরাসরি মানবতার সেবায় নেমে পড়েন এবং ‘মিসরীয় ত্রাণ কমিটি’-র একজন অত্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেন। দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি আন্তর্জাতিক জরুরি খাদ্য সহায়তা সমন্বয়, বাস্তুচ্যুত লাখো পরিবারের জন্য তাঁবু ও আশ্রয় ক্যাম্প স্থাপন এবং ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের মুখে বারবার স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হওয়া ক্ষুধার্ত মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে আহার পৌঁছে দেওয়ার কাজে দিনরাত নিয়োজিত ছিলেন।
গাজার স্থানীয় নাগরিকদের মতে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বড় দপ্তরে বা দামি চেয়ারে বসে কাগজের কাজ করার চেয়ে আল-ওয়াহিদি নিজে সরাসরি প্রখর রোদে মাঠে নেমে ধুলোবালি মেখে কাজ করতে বেশি ভালোবাসতেন। আর এই মানবিক গুণের কারণেই গাজার প্রতিটি কোণায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন অত্যন্ত চেনা, প্রিয় ও বিশ্বস্ত এক অভিভাবক।
আল-ওয়াহিদির এই নৃশংস অবসান প্রসঙ্গে গাজার প্রখ্যাত মানবাধিকার ও সামাজিক অধিকারকর্মী মোহাম্মদ হুমাইদ অত্যন্ত আবেগঘন এক বার্তায় লিখেছেন, “তিনি (আল-ওয়াহিদি) কেবল ত্রাণ কমিটির সাধারণ একজন চাকুরিজীবী বা কর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের মতো অবরুদ্ধ ও ভাগ্যহত মানুষের জন্য পরম আশার এক উন্মুক্ত দুয়ার। গাজায় যারা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন, তাদের প্রত্যেকেই একবাক্যে তাঁর অসীম দয়া, সততা, কোমলতা ও উদারতার কথা স্বীকার করেন।”
হুমাইদ ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও লিখেছেন, “বর্তমান গাজার নির্মম বাস্তবতা হলো—এখানে যারা অন্যের জীবন বাঁচাতে বা সাহায্য করার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন, তারাও ইসরায়েলি বোমার হাত থেকে রেহাই পান না। তবে খুনিরা শরীর মারতে পারলেও ভালো কাজকে কখনো মেরে ফেলতে পারে না। মানুষের অন্তহীন ভালোবাসায় ও হৃদয়ে তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।”
|