
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত গলছে হিমবাহ। ফলস্বরূপ হিমালয় অঞ্চলের অন্তত ২০০টি হ্রদ বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যেগুলো যেকোনো মুহূর্তে ‘টাইম বোমা’র মতো বিস্ফোরিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও তিস্তা নদীর সাথে সরাসরি যুক্ত এই হ্রদগুলো ভেঙে পড়লে বাংলাদেশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নদীপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্য উৎপাদনে সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে হিমালয় পাদদেশীয় দেশগুলোতে এর আলামতও মিলতে শুরু করেছে। ভুটানের হিমালয় অঞ্চলে থাকা ১৭টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের মধ্যে গত ২৯ অক্টোবর ‘শিনতাফু’ নামের একটি হ্রদ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে সংকোষ নদী। একইভাবে গত আগস্টে নেপালের রাসুয়া-তিব্বত সীমান্তে একটি হ্রদ ভেঙে ভাটিতে নেমে আসায় ভোতকোশি-ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রলয়ঙ্কারী বন্যা ও কাদা-পাথরের ঢল নামে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। এছাড়া কেবল সিকিমেই বর্তমানে ৪৭টি হ্রদ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের এই হ্রদগুলো সরাসরি ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও গঙ্গার মতো প্রধান নদীগুলোর সাথে যুক্ত থাকায় এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ভাটির দেশ বাংলাদেশে।
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ান এ বিষয়ে বলেন, "যদি বৃষ্টি না থাকে এবং নদীর পানিও যদি আস্তে আস্তে কমতে থাকে, তাহলে আমাদের দেশের জন্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আমরা একটি পুরোদমে কৃষিনির্ভর দেশ। আমাদের মতো ভাটির দেশে এর ঝুঁকি অত্যন্ত তীব্র। এই বিপদ সম্পর্কে যত দ্রুত আমাদের সম্যক উপলব্ধি আসবে, ততই মঙ্গল।"
পরিবেশকর্মী ও গবেষকদের মতে, উজানের দেশগুলো হিমালয়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলতে গিয়ে যত্রতত্র বাঁধ ও সুড়ঙ্গ নির্মাণ করছে। এর ফলে হ্রদগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়ে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বহুলাংশে বেড়ে চলেছে।
এই সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক কূটনীতি ও যৌথ উদ্যোগের ওপর জোর দিয়ে ওয়াটার কিপার বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, "চীন, নেপাল, ভারত, ভুটান এবং বাংলাদেশকে অবশ্যই একসঙ্গে বসে ভাবতে হবে কীভাবে আমরা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তাসহ প্রধান নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি।"
গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে প্রায় ষাট ভাগের বেশি গতিতে গলছে হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহ। তাই এই মহাবিপর্যয় এড়াতে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন কঠোরভাবে কমানো, দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিক করা এবং পাহাড়ের পর্যটন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধরন আমূল পরিবর্তনের জোর তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা।