
ধর্ম বিষয়ক প্রতিবেদক:উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশ মরক্কোর শেফশাউন প্রদেশের শারাফাত গ্রামে অবস্থিত ‘তারেক বিন জিয়াদ মসজিদ’ দীর্ঘ তেরোশত বছর ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং ইসলাম প্রচারের অন্যতম প্রধান এক ঐতিহাসিক বিশ্বকেন্দ্র হিসেবে টিকে রয়েছে। তৎকালীন টাঙ্গিয়ারের মুসলিম গভর্নর এবং স্পেনের আন্দালুস বিজয়ের মহানায়ক, প্রখ্যাত সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ ৮৫ হিজরি তথা ৭০৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই পবিত্র মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কালের আবর্তে উত্তর আফ্রিকার বহু প্রাচীন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেলেও, এই ইবাদতখানাটি মরক্কোর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন, যেখানে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত একটি ওয়াক্তের জন্যও নামাজ আদায় বন্ধ হয়নি।
আজ রবিবার (১৪ জুন) বিকেলে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইসলামিক স্থাপত্য, গ্লোবাল শরিয়াহ কাউন্সিল ও ধর্মীয় ঐতিহ্য খতিয়ান’ এবং ‘আন্দালুসিয়ান হিস্ট্রি, ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক কালচার ও ওআইসি হেরিটেজ উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে তারেক বিন জিয়াদ মসজিদের গৌরবময় অতীত ও অবহেলিত বর্তমান কন্ডিশনের পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক খতিয়ান অনুযায়ী, মরক্কোর শেফশাউনের শারাফাত অঞ্চলটি ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে রিফ পর্বতমালার দুটি বিশাল পাহাড়ের মধ্যবর্তী অংশে একটি প্রাকৃতিক দুর্গ বা সামরিক মেথড হিসেবে অবস্থিত। আর এই বিশেষ অবস্থানের কারণেই তদানীন্তন সময়ে উমাইয়া খিলাফতের অন্যতম প্রধান সামরিক কমান্ডার তারেক বিন জিয়াদের সেনাবাহিনীর প্রধান সমাবেশস্থল বা ‘ক্যাম্প’ হিসেবে এই মাঠটি নির্বাচিত হয়েছিল। মুসা বিন নুসাইর কর্তৃক টাঙ্গিয়ারের আশেপাশের ঘুমারা ও বারঘাওয়াতা বার্বার উপজাতিদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের আইনি দায়িত্ব পেয়ে সেনাপতি তারেক যখন এখানে ঘাঁটি গাড়েন, তখন হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ফলে সৈন্যদের এবং নতুন মুসলিমদের জামাতে নামাজ ও দ্বীনি শিক্ষার জন্য তিনি নিজের হাতে এই ঐতিহাসিক মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
পাহাড়ি অঞ্চলের প্রথাগত জ্যামিতিক নকশা অনুযায়ী নির্মিত এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর সাদা ও নীল রঙের মিনার এবং লাল টালির ছাদ দূর থেকেই দর্শনার্থীদের চোখ জুড়ায়। আন্দালুস বিজয়ের উদ্দেশ্যে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার আগে টাঙ্গিয়ার শাসনকালের যে কয়েকটি নিদর্শন টিকে আছে, তার মধ্যে এই মসজিদটি অন্যতম প্রধান জীবন্ত দলিল।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এখানে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে সব বয়সের শিক্ষার্থীদের পবিত্র কোরআন হিফজ করানো হচ্ছে। বিশেষ করে স্প্যানিশ ও ফরাসি উপনিবেশ আমলে এই অঞ্চলে ইসলামের বাতিঘর ছিল এই প্রতিষ্ঠান। সে সময় দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র ও এতিম শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা মসজিদের হুজরা বা ছাত্রাবাসে হলেও, তাদের তিনবেলার খাবারের খরচ বহন করত আশেপাশের গ্রামের সচ্ছল মুসলিম পরিবারগুলো। স্থানীয় ভাষায় এই অনন্য ও পরোপকারী মেথডকে ‘মারুফ’ প্রথা বলা হতো। তৎকালীন সময়ের প্রধান শিক্ষকেরা তক্তায় (কাঠের বোর্ড) পবিত্র কোরআনের আয়াত লিখে দিতেন এবং ছাত্ররা সমস্বরে তা তিলাওয়াত ও মুখস্থ করতেন।
ইতিহাসবিদদের একাডেমিয়া খতিয়ান বলছে, এই মসজিদটি কেবল শিক্ষার আলোই ছড়ায়নি, বরং ফরাসি ও স্প্যানিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে মরক্কোর স্বাধীনতা সংগ্রামে এক অসামান্য রাজনৈতিক ও সামরিক ঘাঁটি বা ‘জিহাদের কেন্দ্র’ হিসেবে কাজ করেছে। তৎকালীন সময়ে মুসলমানেরা আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত ও জ্ঞানার্জনকে ‘জিহাদে আকবর’ বা বড় জিহাদ এবং মাতৃভূমি রক্ষায় সশস্ত্র লড়াইকে ‘জিহাদে আসগর’ বা ছোট জিহাদ বলে গণ্য করতেন।
বিগত ১৯২০-এর দশকে আল-মাজদাকি, আল-রাইয়ান এবং আল-বাককালিসহ স্থানীয় বিভিন্ন সম্ভ্রান্ত ও স্বাধীনতাকামী মুজাহিদ পরিবারগুলো স্প্যানিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপরেখা বা গেমপ্ল্যান তৈরির জন্য এই মসজিদের আঙিনাতেই সমবেত হতেন। এখান থেকেই পরিচালিত হয়েছিল ইতিহাসের বিখ্যাত ‘আল কুল্লা যুদ্ধ’, যেখানে স্থানীয় গেরিলাদের চোরাগোপ্তা আক্রমণের মুখে পড়ে আধুনিক স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক বাহিনী জনবল ও সামরিক সরঞ্জামের দিক থেকে এক বিশাল ও নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল।
তারেক বিন জিয়াদ মসজিদটি যুগ যুগ ধরে মালেকি মাজহাবকে মরক্কোর উত্তরাঞ্চলে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এখানে নিয়মিত ‘সালকাহ’ রীতি পালন করা হতো। সালকাহ হলো মরক্কো ও আলজেরিয়ার মুসলিমদের একটি বিশেষ সামাজিক-ধর্মীয় মেথড, যেখানে আলেম ও সাধারণ মানুষ দলগতভাবে পুরো কোরআন শরীফ খণ্ড খণ্ড করে ভাগ করে নিয়ে সম্পূর্ণ খতম সম্পন্ন করেন। এই চারণভূমি থেকে শিক্ষা শেষ করে বহু বিখ্যাত আলেম পরবর্তী সময়ে শরিয়াহ, সুফি তত্ত্ব, সাহিত্য ও মরক্কোর বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে শায়খ আবদুস সালাম বিন মশিশ এবং ফকিহ আবদুল কাদিরের নাম ইতিহাসের পাতায় বিশেষভাবে খোদাই করা আছে।
মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রতীক হিসেবে উনিশ শতকের শেষের দিকে, অর্থাৎ ১৮৮৬ সালে মরক্কোর তৎকালীন সুলতান মৌলে হাসান আল-আউয়াল এবং পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে দেশটির আধুনিক রূপকার প্রয়াত রাজা দ্বিতীয় হাসান এই পবিত্র মসজিদটি পরিদর্শন ও ইবাদত করেছিলেন। ২০১৯ সালে মরক্কোর সংস্কৃতি ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এর অনন্য ঐতিহাসিক মূল্যের কারণে একে ‘জাতীয় ঐতিহ্যের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে।
তবে এই ইতিবাচক পদক্ষেপের মাঝেই এক বড় বিপর্যয় নেমে আসে, যখন ২০১৯ সালেই মরক্কোর ওয়াকফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে এই প্রাচীন মসজিদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ইনস্টিটিউট বা মাদ্রাসাটি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি তার চিরচেনা বৈজ্ঞানিক জৌলুস এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষামূলক কার্যক্রম হারায়। মসজিদের সাবেক প্রবীণ শিক্ষার্থী মুহাম্মদ রাইয়ান বর্তমান কন্ডিশন নিয়ে গভীর ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রুসেড বা ঐতিহ্য হিসেবে এটি যেভাবে বিশ্বদরবারে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য ছিল, সেই অনুযায়ী সরকারি মনোযোগ পায়নি; উল্টো রক্ষণাবেক্ষণের নামে এখান থেকে অনেক মূল্যবান প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক স্মারক অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে।” তবে ইনস্টিটিউট বন্ধ হলেও, স্থানীয়দের উদ্যোগে আজও প্রতি বছর বহু ছেলে-মেয়ে এখান থেকে কোরআন হিফজ সম্পন্ন করে বের হচ্ছে।
জান্নাত সকালবেলা