
আজ শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আত্মশুদ্ধি, ফিকাহ শাস্ত্র ও ইসলামী জীবন খতিয়ান’ এবং ‘শরীয়ত বিশ্লেষণ, ফতোয়া ও সমসাময়িক মাসআলা উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে এই সামাজিক উপাধির শরয়ী খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
আরবি ব্যাকরণ ও অভিধান অনুযায়ী ‘হাজি’ শব্দের অর্থ হলো হজ পালনকারী ব্যক্তি। আর ‘আলহাজ’ শব্দটিও মূলত একই অর্থ বহন করে, যার শুরুতে একটি নির্দেশক অব্যয় যুক্ত রয়েছে মাত্র। আমাদের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত সামাজিক ধারণা হলো—একবার হজ করলে তাকে ‘হাজি’ এবং একাধিকবার হজ করলে ‘আলহাজ’ বলা হয়। অথচ আরবি ভাষা, ব্যাকরণ কিংবা ইসলামী পরিভাষায় এ ধরনের মনগড়া কোনো পার্থক্যের নূন্যতম ভিত্তি নেই।
হজসহ ইসলামের সব ইবাদতের মূল প্রাণ হলো নিয়ত। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত নিখাদ আমলই কেবল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (সহিহ বুখারি)। তাই যদি কেউ সমাজ থেকে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি পাওয়ার গোপন বা প্রকাশ্য আকাঙ্ক্ষায় হজ করেন অথবা হজের পর এ পরিচয়ে মানুষের কাছে বাড়তি সম্মান ও ব্যবসায়িক-সামাজিক সুবিধা প্রত্যাশা করেন, তাহলে তার ইবাদতের পবিত্রতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এবং আমল বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, “তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না। কে বেশি মুত্তাকি, তা আল্লাহই ভালো জানেন।” (সুরা নাজম, আয়াত: ৩২)। এই আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, নিজের নেক আমলকে পরিচয়ের অংশ বানিয়ে আত্মপ্রশংসার পরিবেশ সৃষ্টি করা একজন মুমিনের জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য খতিয়ান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের প্রায় সকল সাহাবিই হজ সম্পন্ন করেছিলেন। ইসলামের চার খলিফা (আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী), জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া আশারায়ে মুবাশশারা এবং অসংখ্য সাহাবি একের অধিকবারও হজ পালন করেছেন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে কোথাও একটি নজিরও পাওয়া যায় না যে, তাঁদের নামের আগে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি যুক্ত করা হতো বা তাঁরা নিজেরা তা লিখতেন। তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিতেন ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান ও উন্নত চরিত্রের মাধ্যমে; কোনো বিশেষ ইবাদতকে সামাজিক উপাধি বানিয়ে নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম)। আবার হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন লোকও থাকবে, যে মানুষের প্রশংসা লাভের জন্য (লোকাচারের উদ্দেশ্যে) ইবাদত করেছিল।
কোনো ব্যক্তি যদি স্রেফ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বা সম্মানের কারণে একজন প্রবীণ হজ পালনকারীকে ‘হাজি সাহেব’ বলে সম্বোধন করেন, তাহলে তাকে সরাসরি ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ বলা যাবে না। কারণ এতে মূলত একজন মানুষকে চেনার বা সামাজিক পরিচয়ের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এটিকে একটি স্থায়ী সামাজিক মর্যাদা, ভিজিটিং কার্ডের অংশ বা বাধ্যতামূলক আইনি উপাধি হিসেবে গ্রহণ করা, কিংবা চিঠিপত্র ও পোস্টারে এভাবে না ডাকলে বা না লিখলে মণ্ডপে অসন্তুষ্ট হওয়া অবশ্যই অনুচিত ও গুনাহের কাজ।
অনেক সমসাময়িক আলেম ও ফকিহের মতে, নামের আগে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি স্থায়ীভাবে সিলমোহর হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামের মূল বিনম্র আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এটি আমলের চেয়ে পরিচিতিকে বড় করে তোলে এবং কখনো কখনো মানুষের মনে রিয়া (লোক দেখানো মনোভাব) ও আত্মতুষ্টির মতো মারাত্মক আত্মিক ব্যাধির কারণ হতে পারে। অতএব, হজ মুসলমানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং কষ্টসাধ্য ইবাদত। এর প্রকৃত সৌন্দর্য সামাজিক উপাধিতে নয়, বরং হৃদয়ের তাকওয়া, বিনয় ও আল্লাহভীতিতে নিহিত। একজন মানুষ পবিত্র মক্কা-মদিনা থেকে ফিরে এসে যদি নিজের চরিত্রে, বৈষয়িক আচরণে এবং আল্লাহর আনুগত্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন, সেটিই তার প্রকৃত সার্থকতা। ‘হাজি’ উপাধি অর্জন নয়; বরং আল্লাহর দরবারে ‘মকবুল হজ’ হিসেবে কবুল হওয়াই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সফলতা।
জান্নাত সকালবেলা