ভাইরাল বক্তব‌্য সম্পর্কে যা বললেন কাদের মির্জা

0
34

নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার চলতি মেয়াদের মেয়র আব্দুল কাদের মির্জা। চলমান পৌরনির্বাচনেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে মেয়রপ্রার্থী। এর আগে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে পৌর-চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এই ছোট ভাই কাদের মির্জা। সম্প্রতি নিজের নির্বাচনি পথসভায় নাগরিকের ভোটাধিকার, ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসন সম্পর্কে তার দেওয়া কিছু বক্তব‌্য সামাজিক যোগাযোগমাধ‌্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দল ও দলের এমপিদের সম্পর্কে তার মন্তব‌্যকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ ছাড়াও দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
কাদের মির্জা তার নির্বাচনি বক্তব‌্য ও এর প্রতিক্রিয়া দলীয় নেতাকর্মীদের বক্তব‌্য সম্পর্কে দেওয়ার এক সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান ব‌্যাখ‌্যা করেন তিনি। তার মুখোমুখি হয়েছেন নোয়াখালী প্রতিনিধি মাওলা সুজন। পাঠকদের জন‌্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
সুজন: কয়েকদিন ধরে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আপনি ভোটের অধিকার, কয়েকজন দলীয় এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। আপনি হঠাৎ কেন এসব বলছেন?
আবদুল কাদের মির্জা: সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে আমেরিকায় যাই চিকিৎসা নিতে। সেখানে চিকিৎসকের কাছে জানতে পারি, পেটের ভেতর দুটি টিউমার আছে। যেকোনো সময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তখন আমি ভেবেছিলাম, আর বাঁচার আশা নেই। তখন শুয়ে শুয়ে নিজ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবলাম। সর্বত্র অরাজকতা ও আর নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আমাকে মানসিকভাবে পীড়া দিলো। চিকিৎসকদের চেষ্টায় ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকি। আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে বসে চিন্তা করলাম, যত দিন বেঁচে থাকবো, সব সময় সত্য কথা বলবো। আপনারা দেখবেন, জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙার পর আমিই প্রথম প্রতিবাদ করেছি। ফ্রান্সে মহানবী (সা.)কে নিয়ে যখন ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের পরও প্রতিবাদ করেছি। যখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের বাড়ি ঘরে হামলা চালানো হয়, তখনো প্রতিবাদ করেছি। এরপর দল, দলের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত এমপির বিরুদ্ধে ও জনগণের ভোটের অধিকারের কথা বলেছি।
সুজন: দলীয় ফোরামে না বলে আপনার নির্বাচনি জনসভা-পথসভায় বলছেন কেন?
আবদুল কাদের মির্জা: ইচ্ছা ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে বলবো। কিন্তু করোনার কারণে পারিনি। তবে, উপজেলা পর্যায়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করেছি। সবাই সমর্থন করেছেন। এরপর দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও সভায় বলেছি।
সুজন: আপনার বড় ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সরকারের মন্ত্রী। আপনার এসব বক্তব‌্য তার জন্য বিব্রতকর নয়?
আবদুল কাদের মির্জা: তিনি বিব্রত হবেন কি না, জানি না। তিনি তো আমাকে এসব বক্তব্যের ব্যাপারে কিছু বলেননি। তার পক্ষ থেকে আমার ওপর কোনো চাপ নেই। তবে তিনি বলেছেন, নির্বাচন করো,মনোযোগী হও।

সুজন: ভাইরাল বক্তব্যগুলোর ব্যাপারে দল যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে কী করবেন?
আবদুল কাদের মির্জা: দল হয়তো বহিষ্কার করবে। জেল দেবে। দিক। তারপরও বলে যাবো জাতির জনকের কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের কথা, ওবায়দুল কাদেরের উন্নয়নের কথা। সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে থাকবো। সাধারণ মানুষের সেবা অব্যাহত রাখবো। বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে সত্য কথা বলে যাবো।
সুজন: আপনার ভাইরাল বক্তব্যগুলো আওয়ামী লীগের সারাদেশের নেতাকর্মীদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই বিষয়কে কিভাবে দেখছেন?
আবদুল কাদের মির্জা: আমার বক্তব্য বৃহত্তর নোয়াখালীকেন্দ্রিক আওয়ামী রাজনীতি নিয়ে। সারাদেশের নেতাকর্মীরা ইতিবাচক না নেতিবাচকভাবে নিচ্ছেন, জানি না। তবে চামচাগিরি, তোষামোদি, অপরাজনীতি, টেন্ডারবাজি, মাদক, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া এসব সমস্যা সব জায়গায় থাকবে। সবাই যদি আমার কথাগুলো ইতিবাচকভাবে নেন, তাহলে ধন্যবাদ দেবো।
সুজন: নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে সংশয় আছে কি না? আপনি সরকার দলীয় প্রার্থী হয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দাবি করছেন। কেন?
আবদুল কাদের মির্জা: এখানে নির্বাচন নিয়ে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ না হয় সে জন্য একটি মহল তৎপর রয়েছে। তবে, আমি সরকার দলীয় নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়ে প্রশাসনের কাছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি। আমি দেখিয়ে দিতে চাই, গণতন্ত্র কী? ভোটাররা তাদের ভোট নির্ভয়ে ও অবাধে যেন দিতে পারেন, সে ব্যাপারে প্রশাসন যেন পদক্ষেপ নেয়। আমি প্রমাণ করতে চাই, জনগণের ভোটের অধিকার আদায় হয়েছে। যদি আমি জিততেও না পারি, আপসোস থাকবে না। যিনি জিতবেন, তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে চলে যাবো। বসুরহাট পৌরসভার সাধারণ ভোটারদের বলতে চাই, কেন্দ্রে আসুন, নির্ভয়ে ভোট দিন। যাকে খুশি ভোট দেন। যদি কোথাও বাধা দেওয়া হয়, সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে জানান। এখান থেকেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন জনগণের ভোটের অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হোক।
সুজন: আওয়ামী লীগের নোয়াখালী জেলা কমিটিতে আপনি সহ-সভাপতি হিসেবে আছেন। এই কমিটিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
আবদুল কাদের মির্জা: আমি এই কমিটি মানি না। ১৯৭৫ পরবর্তী আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে যারা রাজপথে ছিলেন, তারা এ কমিটিতে নেই।
সুজন: প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতির কাছে আপনার কোনো আবেদন আছে কি না?
আবদুল কাদের মির্জা: আছে। আমার কিছু আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আছে। সেগুলো হলো দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজ, নারী ও মাদকের সঙ্গে জড়িত কিছু এমপি আছেন,বড় বড় কিছু নেতা আছেন, আমলা আছেন, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিন। আপনি এক মাত্র নেত্রী , আপনিই পারেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে। কিছু কিছু নেতা বা আমলা তাতে বাধা দিতে আসবে, তাদের প্রশ্রয় দেবেন না। আপনি শেখ হাসিনা বাংলাদেশে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করছেন। এটা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন, বিশ্বে রোল মডেল হয়ে থাকবে। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির, পুল-কালভার্ট, মক্তব-মাদ্রাসা; এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে উন্নয়ন করেননি। আমাদের পৌরসভার কাজগুলো আপনার সহযোগিতায় করেছি। আপনি সারা বাংলায় যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছেন, তা অবিস্মরণীয়। জনগণের ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তৃণমূল পর্যায়ে যে উন্নয়ন করেছেন, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা চালু করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি করেছেন, শিক্ষার উন্নয়নে যে ভূমিকা রেখেছেন, তাতে সারাদেশে আপনার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আছে। আপনিই পারেন দেশকে মাদক ও সন্ত্রাস মুক্ত করতে। সরকারি যারা চাকরি করবেন, তাদের ডোপ টেস্ট করে চাকরিতে প্রবেশের প্রথা চালু করুন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের আবেদন শুনুন। বেরিয়ে আসবে দলের না জানা অনেক সত্য কথা। তাহলে আপনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন। আপনিই পারেন জনগণের ভোটের অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে।
আপনি চান নির্বাচনে ফল। কিন্তু কিছু নেতা ও বড় বড় আমলা আছেন, তারা আপনাকে গাছসহ ফল দিয়ে দেন। এই নেতা ও আমলাদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। তারা যেন আপনার কর্মযজ্ঞকে বির্তকিত না করতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলা ও আপনার যে ভোটের অধিকারের রাজনীতি, তা বাস্তবায়নে তারা যেন বাধা হতে না পারেন। তাদের ছেঁটে ফেলতে হবে।