প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্পের দুর্নীতি প্রমাণিত

তালতলী জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প নির্মাণ প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের দুর্নীতি প্রমাণিত

বরগুনার তালতলীতে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ প্রকল্পের শুরুতেই দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্তসহ ৬ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। তবে টেকনিক্যাল বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আগে বুয়েট বা আইডব্লিউএমকে দিয়ে সার্বিক কার্যক্রম যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি, প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত এক কোটি ৮২ লাখ টাকাসহ ব্যয় হওয়া অর্থ আদায়ের সুপারিশ করে। এটি পরিবেশবান্ধব এবং প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প।

প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে অর্থ ফেরতসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশনকে (বিএসইসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ৩০ ডিসেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনার চিঠিসহ তদন্ত প্রতিবেদন বিএসইসি’র চেয়ারম্যানকে পাঠিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়।

প্রসঙ্গত, গত ৪ অক্টোবর দৈনিক যুগান্তরে ‘বরগুনার তালতলীর বঙ্গোপসাগরের মোহনায় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প নির্মাণ প্রকল্পের শুরুতেই ভয়াবহ দুর্নীতি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর নড়েচড়ে বসে শিল্প মন্ত্রণালয়। সংবাদ প্রকাশের পর গত ৫ অক্টোবর ঘটনার তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করে।

এ প্রসঙ্গে বিএসইসির চেয়ারম্যান মো. রইছ উদ্দিন রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘বরগুনার তালতলীর জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প নির্মাণ প্রকল্পে সমীক্ষার কাজে অনিয়মের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ কাজে দুর্নীতি হয়েছে। এটা আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগের ঘটনা। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দেখিয়ে চুক্তি করা হলো, এ প্রশ্নটি প্রথম আমিই উত্থাপন করি। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা শিগগিরই সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করব।’

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালতলীর জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদন করতে কার্যাদেশ দেওয়া হয় কোরিয়াভিত্তিক কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান জেনটেক ইঞ্জিনিয়ারিংকে। কার্যাদেশের শর্ত ভঙ্গ করে ওই প্রতিষ্ঠানের লোকাল এজেন্ট কন্সট্রাকশন, সরবরাহকারী এবং আমদানি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান টারবো মেশিনারিজ সার্ভিস বাংলাদেশকে ওই সমীক্ষার কাজ দেওয়া হয়েছে। সবকিছু জানা-বোঝার পরও ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিএসইসি এবং সেসব সমীক্ষা প্রতিবেদন গ্রহণের পর বিল পরিশোধ করে প্রকল্প পরিচালক। শুধু তাই নয়, ওই ভুয়া পরামর্শ প্রতিষ্ঠানকে কাজের অতিরিক্ত ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টারবো মেশিনারিজকে দুই কিস্তিতে (২০ এবং ৪০ ভাগ) ৬০ ভাগ বিল পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ এ দুটি কিস্তিতে ২ কোটি ৭৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বিল পরিশোধের সময় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রয়োজনীয় কোনো কাগজ চায়নি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। কাজই তদন্ত কমিটির কাছে এ সংক্রান্ত কোনো কাগজও তারা দেখাতেও পারেননি। এক্ষেত্রে চুক্তিপত্রের ৫১ দশমিক ১ ধারা মোতাবেক ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। বড় বিষয় হচ্ছে, বিএসইসি’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোরিয়াভিত্তিক কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান জেনটেক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে চুক্তি না করে বাংলাদেশি এজেন্ট ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে বিল পরিশোধ করে, যা বিধিসম্মত হয়নি।

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ ও মতামতে বলা হয়েছে, পরামর্শ প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধের আগে বিএসইসির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিশেষ শর্তাবলিতে উল্লিখিত ধারা অনুযায়ী চুক্তিমূল্য পরিশোধ করা সমীচীন ছিল। এক্ষেত্রে সেটা করা হয়নি। এছাড়া বিএসইসি থেকে বিল পরিশোধের আগে মূল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিলসহ সত্যায়ন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কোনো ধরনের সত্যায়ন ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যা যথার্থ হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে এ বিল পরিশোধের অডিট আপত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে সমীক্ষা প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থ হলে এ পরিশোধিত চুক্তিমূল্য ফেরতযোগ্য মর্মে গণ্য করতে হবে।

তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিএসইসির সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক প্রকল্পের জরিপ কাজটি দেওয়ার কথা ছিল ‘সার্ভে ২০০০’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু কাজটি করানো হয়েছে ‘ল্যান্ড সার্ভে টিম’ দিয়ে। ‘সার্ভে ২০০০’ এর অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে বিবেচনা করেই কোরিয়াভিত্তিক ‘জেনটেক ইঞ্জিনিয়ার্সকে’ বাছাই করা হয়। চুক্তির শর্ত মোতাবেক বিএসইসি’র পূর্বানুমোদন না নিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে তাই করা হয়েছে । শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম চলাকালে বিএসইসি অনিয়মগুলো অনুমোদন করে এর বৈধতা দেয়। একই সঙ্গে বিলও পরিশোধ করা হয়, যা বিধিসম্মত হয়নি।

এছাড়া এ প্রকল্পের গৃহীত চুক্তিপত্র, পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর ২০০৮ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর না করে লোকাল এজেন্টের সঙ্গে বিএসইসির পক্ষে প্রকল্প পরিচালক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তিতে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম যথাযথভাবে মনিটরিং ও সুপারভিশন না হওয়ায় এসব বিচ্যুতি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। যথাযথভাবে বিধিবিধান ও চুক্তির শর্ত অনুসরণ করলে এ ত্রুটি হতো না। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার জন্যই প্রকল্পটি এ অবস্থায় উপনীত হয়েছে। আর গুরুত্বপূর্ণ এ সমীক্ষার কাজটি চুক্তি মোতাবেক যথাযথভাবে সম্পাদন করা প্রকল্প পরিচালকেরই দায়িত্ব। তাই যথাসময়ে এ কাজটি সম্পাদিত না হলে মূল প্রকল্প অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প নির্মাণের কাজ পিছিয়ে পড়বে। এজন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বিএসইসিকে এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার এমবি কলেজ মাঠে ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সভায় বলা হয়, পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালি উপজেলার বড় বাইশদিয়া ইউনিয়নের জাহাজমারা চর পয়েন্টে পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙ্গা এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন ও শিপইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। এরপর থেকেই এ সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here