ঈদের দিনেও আনন্দ নেইঃএ এফ রহমান

167
kggmdfvlihkmj

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ লাল সবুজের পতাকা পরিহিত এক অপূর্ব প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সৃষ্টি এ বাংলাদেশ। রাত পেরুতেই সকালের সোনালী সূর্য উঠবে আর শুরু হয়ে যাবে ঈদের দিন। কিন্তু ভারাক্রান্ত মন আজ সকলের এতটাই ভারাক্রান্ত যে ঈদ মোবারক জানানোর মতো মন মানসিকতা নিজের ভিতর তৈরি করা যাচ্ছে না। মনের ভিতর যেভাবে দুঃখ লুকিয়ে আছে ঠিক তেমনি লুকিয়ে আছে সারা অঙ্গে। আর সেই কারণ হিসেবে একটু পিছনে যেতে চাই ফিরে তাকাতে চাই দুঃখের দিনগুলো কিভাবে শুরু হল।দুটি কারণঃ১.করোনা নামক ভাইরাস ২. ঘূর্ণিঝড় আম্ফান।

করোনা ভাইরাস আসলে কি?গঠনগতভাবে করোনা ভাইরাস একটা বিশাল আরএনএ (RNA) ভাইরাসের পরিবার। “করোনা” শব্দটার আক্ষরিক অর্থ হলো মুকুট। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের তলায় এই পরিবারের ভাইরাসকে অনেকটা রাজার মাথার মুকুটের মতন দেখায়, সেই থেকে এই নামকরণ । অন্যসকল ভাইরাসের মতো এরাও জীবনধারণ ও বংশবৃদ্ধির জন্য কোন না কোন একটা প্রাণী বা উদ্ভিদ কোষের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে।এই ভাইরাসের সবচেয়ে বাইরের অংশে থাকে গ্লাইকোপ্রোটিনের স্পাইক বা কাঁটা যেগুলোর সাহায্যে ভাইরাসটা জীবন্ত কোষে আটকে গিয়ে সংক্রামিত হয়। দ্বিতীয় উপাদানটা হলো রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা আরএনএ (RNA)। জীবন্ত কোষের ভিতরে প্রবেশ করে ভাইরাসটা আরএনএ-র প্রতিলিপি তৈরি করে বংশ বিস্তার করে। আর তৃতীয় উপাদানটা হলো একটা লিপিড স্তর, এটা ভাইরাসের অন্যান্য অংশকে ধরে রাখে। করোনাভাইরাস-এর মারাত্মক প্রকোপ এবং এবং তাকে কিকরে ঠেকিয়ে রাখা যায়, সেটা বুঝতে হলে এই তিনটে অংশের কথাই আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

করোনা ভাইরাস-এর গঠনঃ
যদিও করোনাভাইরাসের অনেক প্রজাতি আছে, তার মধ্যে মাত্র সাতটা প্রজাতি মানুষের দেহে রোগ সংক্রমণ করতে পারে।এদের মধ্যে চারটে সারা বছর ধরে অত্যন্ত সাধারণ হাঁচি-কাশি সর্দির উপসর্গ সৃষ্টি করে। এরা হল,(আলফা করোনাভাইরাস), (আলফা করোনাভাইরাস), (বিটা করোনাভাইরাস), (বিটা করোনাভাইরাস)।এছাড়া, মার্স কভ (MERS-CoV) – এটা একটা বিটা করোনাভাইরাস যা থেকে ২০১২ সালে মিড্ল্ ইস্ট রেস্পিরেটারি সিন্ড্রোম বা মার্স (Middle East Respiratory Syndrome, or MERS) ছড়িয়েছিল। সার্স কভ (SARS-CoV)– এটা একটা বিটা করোনাভাইরাস যা অতি তীব্র শ্বাস রোগ বা সার্স (severe acute respiratory syndrome, or SARS) ছড়িয়েছিল। প্রথম ২০০২ সালে চীন দেশে এই রোগ দেখা গিয়েছিল। মৃত্যুর হার প্রায় ১০০ রোগীপিছু ১০, তবুও এই রোগকে দ্রুত বাগে আনা গেছিলো কারণ মানুষ থেকে মানুষে তার সংক্রমণের হার ছিল কম। সব মিলিয়ে মোট ৮,০০০-এর কাছাকাছি রোগী এই রোগে আক্রান্ত হয় ও প্রায় ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়। গবেষণায় প্রমাণ হয় যে একধরনের গন্ধগোকুল প্রজাতির প্রাণীর থেকে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল। তৃতীয় আরেকটা টাইপ, সার্স কভ-২ (SARS-CoV-2) (severe acute respiratory syndrome coronavirus 2)-কেই নভেল করোনা ভাইরাস বলা হয়। এই সার্স কভ-২ মানুষের শরীরে কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস ডিসিজ সংক্রামিত করে। এই ভাইরাসকে নভেল বা নতুন বলা হচ্ছে কারণ এই সংক্রামক ভাইরাসটা এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি।

ভাইরাসটার আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি (2019-NCOV)। মানুষ থেকে মানুষে এর সংক্রমণের হার প্রচণ্ড বেশি।আর এই প্রজাতিটি গত বছর ডিসেম্বর চিনের উহান শহরে প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছিলো। পাঁচ মাস কাটিয়ে আজ তা বিশ্বের নানা প্রান্তে মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে আমেরিকা, ইউরোপের প্রথম বিশ্বের দেশগুলি। সংক্রমণ আটকাতে এখন অধিকাংশ দেশেই লকডাউনের আশ্রয় নিয়েছে। ফলে প্রতিটি দেশেই দেখা দিয়েছে আর্থিক মন্দা। প্রতিদিনই কাজ হারাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। এককথায় গোটা বিশ্বকে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে এই করোনা ভাইরাস।আমরা বাংলাদেশও এর থেকে ভিন্ন নয়। তাই আজ ঈদ মোবারক জানাতে নিজের অনুভূতিগুলো অজান্তেই আশ্রয় নিয়েছে নীরবতার। এই করোনা কালীন সংকট মুহুর্তের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে চেপেছে মাথার উপর।সেটি হলো ঘূর্ণিঝড় “আম্ফান।

ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার দুপুরের পর বঙ্গোপসাগরের পূর্বদিক সুন্দরবন ঘেঁষে পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আছড়ে পড়ে৷ স্থলভাগে উঠে আসার প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাণ্ডব চালাতে চালাতে আমপান বাংলাদেশ উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়৷ঘূর্ণিঝড় আম্ফান বিকাল ৫টার দিকে উপকূলের বাংলাদেশ অংশে পৌঁছায়। এটি ভারতের সাগারদ্বীপের পাশ দিয়ে সুন্দরবন ঘেঁষে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ভূভাগে উঠে আসে৷ওই সময় এর কেন্দ্রের কাছে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ১৮০ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝেড়ো হাওয়ার আকারে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল৷
ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ব্যাস ছিলো প্রায় ৪০০ কিলোমিটার।
স্থলভাগে উঠে আসার পর বৃষ্টি ঝরিয়ে আম্ফানের শক্তিক্ষয় শুরু হলেছিলো।গত ১৬ মে নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়া আম্ফান এক পর্যায়ে শক্তি বাড়িয়ে সুপার সাইক্লোনে পরিণত হয়েছিল৷ বঙ্গোপসাগরের এ শতাব্দীর প্রথম সুপার সাইক্লোন ছিল এটি৷ কিন্তু উপকূলের দিকে ধেয়ে আসতে আসতে কিছুটা শক্তি হারিয়ে তা আবার অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়৷এক দশকের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় এটি।

ভারতীয় আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে আম্ফান পশ্চিমবঙ্গের দিঘার কাছাকাছি এলাকা দিয়ে উপকূল অতিক্রম করা শুরু করে৷ সে সময় এর অবস্থান ছিল ভারতের সাগরদ্বীপ থেকে ৩৫ কিলোমিটার, দিঘা থেকে ৬৫ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশের খেপুপাড়া থেকে ২২৫ কিলোমিটার দূরে৷

এদিকে, আম্ফানের প্রভাবে ঝড়ো বাতাসে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো অস্বাভাবিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।আম্ফানের প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বলেশ্বর নদের মাঝের চরে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয় ও ফসলের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে৷পাশের জেলা বরগুনার তিনটি প্রধান নদীর পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে৷ স্বাভাবিকের তুলনায় নদীর পানি অন্তত ৬/৭ ফুট বেড়ে গেছে৷

এভাবে উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো পুরোপুরি ভাবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ভেঙে গেছে তাদের বাড়িঘর শেষ হয়ে গেছে তাদের ফসল। কেউ কেউ অর্ধাহারে-অনাহারে কাটাচ্ছে দিন।

এভাবে একদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান অন্যদিকে বৈশ্বিক Covid-19 এর প্রভাব। সবমিলিয়ে থমকে আছে অর্থনীতি। ধমকে আছে আমাদের লেখাপড়া। থমকে আছে জীবন-জীবিকা থমকে আছে হাজারো স্বপ্ন। অনেকে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে গ্রামের উদ্দেশ্যে। তাই এই দুঃসময়ে কিসের বা “ঈদ-মোবারক” কিসের বা আনন্দ-উল্লাস!!
লেখক,কবি